ট্রাইকোডার্মার ব্যবহার ও উপকারিতা

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ট্রাইকোডার্মা

About Trichoderma Biofertilizer

Trichoderma Biofertilizer
ম‌ো:তরিকুল ইসলাম Junior Assistant at Rural Development Academy (RDA), Bogra, Bangladesh
Print Print
Pin It

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ,এদেশে ফসল উৎপাদনে প্রচুর ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় যা আমাদের প্রাকৃতিক এবং শারীরিক নানা সমস্যা সৃষ্টি করে,আর তাই মাটির প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষা এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে – রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মুক্ত কৃষিপণ্য  উৎপাদনে’ ট্রাইকোডার্মা (এক ধরনের বিশেষ উপকারি ছত্রাক) ও ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করে সবুজ প্রযুক্তিতে ফসল উৎপাদন করতে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর একদল গবেষক উৎপাদন করছে ট্রাইকোডার্মা জৈব সার। এটি ফসলে ব্যবহার করলে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের (কীটনাশক) ব্যবহার কমে আসবে। উৎপাদন দ্বিগুণ হবে।

দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের বিকল্প নেই বলে মত দেন কৃষি বিজ্ঞানী এ কে এম জাকারিয়া। পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারে কৃষকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। ট্রাইকোডার্মা বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে বলে স্থানীয় কৃষকরা দাবি করেছেন।

ট্রাইকোডার্মার পরিচিতি:

বগুড়া আরডিএ ট্রাইকোডার্মা ল্যাবরেটরী সূত্র জানায়, ট্রাইকোডার্মা হচ্ছে মাটিতে মুক্তভাবে বসবাসকারি উপকারি ছত্রাক- যা উদ্ভিদের শিকড়স্থ মাটি, পঁচা আবর্জনা ও কম্পোস্ট ইত্যাদিতে অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়।এটি মাটিতে বসবাসকারি উদ্ভিদের ক্ষতিকর জীবাণু যেমন- ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও নেমাটোডকে মেরে ফেলে। ট্রাইকোডার্মা প্রকৃতি থেকে আহরিত এমনই একটি অণুজীব যা জৈবিক পদ্ধতিতে উদ্ভিদের রোগ দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ট্রাইকোডার্মা বায়োপেস্টিসাইডটি প্রথম আবিষ্কার করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বাহাদুর মিয়া।যা ২০১৩ সালের জুন মাসে বগুড়া আরডিএ ল্যাবরেটরীতে গবেষণার মাধ্যমে কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়।

ট্রাইকোডার্মার ব্যবহার ও উপকারিতা:

এটি ট্রাইকো-সাসপেনশন, পাউডার এবং পেস্ট আকারে উৎপাদন সম্ভব।নিয়মানুযায়ী স্প্রে করলেই এর কার্যকারিতা পাওয়া যায়। পঁচা আবর্জনায় ‘ট্রাইকো-সাসপেনশন’- এর জলীয় দ্রবণ মিশিয়ে দ্রুত সময়ে ট্রাইকো-কম্পোস্ট উৎপাদন করা সম্ভব।এটি সহজলভ্য হওয়ায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। এর ব্যবহারে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব। বীজশোধনে ও মাটিবাহিত উদ্ভিদের রোগ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।এছাড়াও উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে ট্রাইকোডার্মা। এর ব্যবহারে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় হয়। জমিতে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না। মাটির উর্বরা শক্তি বাড়ায়। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমায় ৪০%-৬০%।

ট্রাইকোডার্মা জৈব সারের উপকারীতাঃ

* ট্রা্ইকো-জৈব্ সার মাটিতে বসবাসকারী ট্রাইকোডার্মা ও অন্যান্য উপকারী অনুজীবের সংখ্যা বাড়িয়ে অনুর্বর মাটিকে দ্রুত উর্বরতা দান করে এবং ক্ষতিকর ছত্রাককে ধংস করে।
* মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়। পানির অপচয় রোধ ও সেচ খরচ কম হওয়ার ফলে কৃষকের আর্থিক সাশ্রয় হয়।
* মাটির অম্লতা, লবনাক্ততা, বিষক্রিয়া প্রভৃতি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
* মাটি ও ফসলের রোগবালা্ই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার ফলে পরিবেশের উন্নতি ঘটে এবং বিষমুক্ত খাদ্য-শস্য উৎপাদনের সম্ভাবনাকে বহুগুনে বাড়িয়ে দেয়।
*গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের বেশির ভাগের উপস্থিতির কারনে কমপক্ষে 
৩০% রাসায়নিক সার সাশ্রয় হয় বলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমে আসে।

*ফসলের উৎপাদন ও গুণগতমান বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

অধিক ফলনে ট্রাইকোডার্মা জৈব সার প্রয়োগ মাত্রাঃ (প্রতি শতকে)
আলুর জন্য = ৭ কেজি
সবজির জন্য = ৫ কেজি
ভূট্টার জন্য = ৮ কেজি
ধানের জন্য = ৭ কেজি

প্রতিবেদন রিপোর্ট : গবেষণা ও রচনা: ড. একেএম জাকারিয়া
গবেষণা সহযোগীঃ সমীর কুমার সরকার, আবিদ হোসেন মৃধা, শুভাগত বাগচি, রেবেকা সুলতানা।
জনস্বার্থে: পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া।

পরীক্ষামূলক ব্যবহারে সফলতা:

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গারিদাহ ইউনিয়নের কানুপুর গ্রামের কৃষক মাসুদ রানার বেগুন ক্ষেতে, আবুল কালামের করলা ক্ষেতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয় ট্রাইকোডার্মা।কৃষক মাসুদ রানা বলেন, “এটি ব্যবহারে ফলন দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিবার বর্ষায় বেগুন গাছের গোড়া পঁচে যেত। এবার কীটনাশক ছাড়াই আবাদ করেছি। রাসায়নিক সার নামমাত্র ছিটিয়েছি।”

একই গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, “এটি বাজারে না পাওয়ায় আমরা চিন্তিত। করলা জমিতে ট্রাইকোডার্মা ছিটিয়ে ফলন বেশি পেয়েছি। কোন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়নি।”

আরডিএ কৃষি বিজ্ঞান বিভাগের বক্তব্য- বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী কৃষি বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক ও ট্রইকোডার্মা গবেষক এ কে এম জাকারিয়া বলেন, ‘এদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলো কৃষি। বর্তমান কৃষি ব্যবস্থা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল।’

১৯৫৬ সালে ৩৫০ কেজি কীটনাশক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার প্রথম শুরু হয়। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী (২০১৩)১৫ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে এদেশের মাটিতে। এছাড়া চোরাই পথে আসা শত শত মেট্রিক টন কীটনাশক আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই কৃষিতে ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। এটি বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। আরডিএ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান -এর পক্ষ থেকে  ট্রাইকোডার্মার ব্যবহার সম্পর্কে কৃষকদের  নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়,যার সময়সূচি rda.gov.bd এখানে পাওয়া যাবে,কৃষকরা প্রশিক্ষণ শেষে নিজেরাই সার উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছে।

  •   ট্রাইকোডার্মা /ট্রাইকোডার্মা জৈব সার বিষয়ক পরামর্শের জন্যে যোগাযোগ করুন এই নম্বরে: ০১৭০৭১০০৮৫১
2350 Total Views 2 Views Today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>